নবায়নযোগ্য জ্বালানি

বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিদ্যুতের সম্ভাবনা নিয়েও পিছিয়ে আফ্রিকা

আফ্রিকার উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বে রয়েছে বড় গ্যাস ক্ষেত্র। দক্ষিণ আফ্রিকা কয়লা ও বিশাল জলবিদ্যুতের জন্য সম্ভাবনাময়।

আফ্রিকার উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বে রয়েছে বড় গ্যাস ক্ষেত্র। দক্ষিণ আফ্রিকা কয়লা ও বিশাল জলবিদ্যুতের জন্য সম্ভাবনাময়। উত্তর ও দক্ষিণ উপকূলে শক্তিশালী বায়ুশক্তি এবং সাহারা, নামিব ও কালাহারি মরুভূমি অবিশ্বাস্য পরিমাণ সৌরশক্তির আধার। নবায়নযোগ্য জ্বালানির এসব উৎস কাজে লাগিয়ে বিশ্বে সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারত মহাদেশটি। কিন্তু বাস্তবে এর ধারেকাছেও নেই।

নেদারল্যান্ডসের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি সূর্যালোক পায় আফ্রিকা, জনসংখ্যা প্রায় ৯০ গুণ বেশি এবং আয়তনে প্রায় ৮০০ গুণ বড়। অথচ গত বছর পুরো মহাদেশের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ইউরোপের দেশটির তুলনায় কম ছিল। উত্তর ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কয়েকটি ধনী ও তুলনামূলকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলো ছাড়া চাহিদার তুলনায় এখানে বিদ্যুৎ গ্রিড খুবই কম। সব মিলিয়ে পর্যাপ্ত, সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব আফ্রিকায় মানব উন্নয়ন ও অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

আফ্রিকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিশেষ করে গ্রিডে বিনিয়োগ খুবই দুর্বল। ১৯৫০-৭০-এর দশকে নির্মিত মিসরের আসওয়ান হাই ড্যাম, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ের কারিবা এবং ক্যামেরুনের বামেনজিংয়ের মতো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এখন চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। বৃষ্টি ও নদীর পানিপ্রবাহে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা তো রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফ্রিকায় বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুর্বল নীতি।

তারা বলছেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে এখনো বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ট্রান্সমিশন লাইনে বিনিয়োগ এখনো লাভজনক নয়। মূলধনি ব্যয় অনেক। কম জনসংখ্যা ও দূরবর্তী এলাকাগুলোয় বিদ্যুৎ পৌঁছানোর খরচ অনেক বেশি। ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম সাধারণ মানুষ ও শিল্প-কারখানার জন্য চড়া হয়ে থাকে।

অপর্যাপ্ত গ্রিড সংকট কাটাতে প্রায় ১০০ গিগাওয়াট ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার হচ্ছে আফ্রিকায়। যার দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বড় শিল্প ইউনিট, খনি বা বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোয়। কিন্তু সনাতনী এ প্রযুক্তি ব্যয়বহুল ও দূষণকারী। বিদ্যুৎ সরবরাহে অতিপ্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করলেও ডিজেল জেনারেটর শিল্পায়নের জন্য টেকসই সমাধান নয়। ইউরোপ ও বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের অনুমোদন দেয় না। অথচ উত্তর ও দক্ষিণ আফ্রিকার উন্নত বাজার বাদ দিলে মহাদেশের বাকি ৪৮টি দেশে ব্যবহৃত সৌরবিদ্যুৎ ইউরোপের মাত্র ১ শতাংশ।

অবশ্য কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। আফ্রিকায় চীনা সৌর প্যানেল সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এম্বারের বিশ্লেষণ অনুসারে আফ্রিকায় ২০২২-২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত চীনা সৌর প্যানেলের মাসিক আমদানি পাঁচ গুণের বেশি বেড়েছে। শুধু আগস্টে ১ দশমিক ৭৪ গিগাওয়াট প্যানেল এসেছে।

অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কের ফলে চীনের সস্তা সৌর প্যানেলের অন্যতম বাজারে পরিণত হয়েছে আফ্রিকা। আলজেরিয়া, বতসোয়ানা, ইরিত্রিয়া, লাইবেরিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলো প্যানেল আমদানি প্রায় শূন্য থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছে। মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সৌর প্যানেল আমদানিকারক হিসেবে মিসরকে ছাড়িয়ে গেছে নাইজেরিয়া। এমনকি চাঁদের মতো বহির্বিশ্বে কম পরিচিত দেশ সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

সৌরশক্তি সবসময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না এবং মধ্য আফ্রিকায় রয়েছে দীর্ঘ বৃষ্টির মৌসুম। বিশ্লেষকরা বলছেন, আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে ব্যাটারি, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস ও ভূতাপীয় শক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে সৌরবিদ্যুৎকে। এতে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের সুফল পুরোপুরি মিলবে।

চীনা উৎপাদন, স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন অর্থায়নের সমন্বয়ে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু হয়েছে। মিনি-গ্রিড গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের জন্য ভালো সূচনা। কিন্তু এগুলো শেষ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হতে হবে। এছাড়া আফ্রিকার সৌর প্রকল্পে অর্থায়ন এখনো ব্যয়বহুল। মধ্যপ্রাচ্যের নবায়নযোগ্য উদ্যোগে সুদহার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এর বিপরীতে আফ্রিকায় প্রায় ১১ শতাংশ। —দ্য ন্যাশনাল অবলম্বনে

আরও